কলমাকান্দায় মজিবুর মাস্টারের অর্থ আত্মসাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলাঃ উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপের দাবি স্থানীয়দের
নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি
মোঃ কামরুল হাসান।।
নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়ন সমবায় সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি লিমিটেডের প্রায় ২৫ লাখ ৬১ হাজার ১৬৯ টাকা আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে পোগলা ইউনিয়নে। সম্প্রতি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সমিতির টাকা আত্মসাতের খবর প্রকাশ হওয়ার জেরে স্থানীয়দের দুপক্ষের মাঝে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের ধারাবাহিকতায় দু’পক্ষই মানববন্ধন করেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়,২০১৮-২০১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে সমিতির বিভিন্ন খাত থেকে মোট ২৫ লাখ ৬১ হাজার ১৬৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। অডিট কমিটির প্রতিবেদনে ভুয়া ভাউচার, কার্বন কপি ফাঁকা রাখা রশিদসহ হিসাবের বড় ধরনের গরমিলের বিষয়টি সামনে আসে। পিবিআইয়ের দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমিতির সাবেক সভাপতি, সেক্রেটারি ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতারণামূলকভাবে অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। সমিতির তহবিল পরিচালনায় ব্যাংক লেনদেন, সঞ্চয়, ঋণ কার্যক্রম, সভা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে নানা অনিয়ম পাওয়া গেছে।
তদন্তসূত্রে আরো জানা গেছে যে, সোনালী ব্যাংক পিএলসি কলমাকান্দা শাখার স্টেটমেন্ট অনুযায়ী সমিতির হিসাবে জমা ও উত্তোলনে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান , মো. তঞ্জিল খান (সেক্রেটারি) ও সোহাগ খান (প্রাক্তন ম্যানেজার, সহযোগিতার অভিযোগ)। তাছাড়া তদন্তে আক্কাছ মিয়া ও আ. ছবুর নামের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় (বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণা) প্রাথমিকভাবে অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেছে। এমনকি একজনের বিরুদ্ধে ১০৯ ধারায় সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রধান অভিযুক্ত মজিবুর রহমান বর্তমানে উপজেলার বড়খাপন ইউনিয়নের একতা উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত রয়েছেন। সে পোগলা ইউনিয়নের মানপুর গ্রামের বাসিন্দা।
সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে স্থানীয় কৃষকদের আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচীতে অভিযোগ করা হয়, প্রধান অভিযুক্ত মজিবর মাস্টারের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে গত পরশুদিন কয়েকজন বহিরাগত যুবক এনে ভিডিও ধারন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থআত্মসাতের মামলার বাদীপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করণে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়৷ মূলত অর্থ আত্মসাতের মামলায় দোষ প্রমাণিত হওয়ায় এধরণের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় কৃষকরা।
এব্যাপারে সমিতিটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও ৩নং পোগলা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর আলম জানান, “সমিতির প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রধান আসামী মজিবুর মাষ্টার। নির্বাচনে পরাজয়ের পর টাকা পরিশোধ এড়াতে বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। তবে প্রতিটি অভিযোগেই নির্বাচিত কমিটির পক্ষে সিদ্ধান্ত আসে। এসব করে ব্যর্থ হয়ে এখন নানাভাবে ষড়যন্ত্র করে আসছে মজিবুর মাস্টার। এরই অংশ হিসেবে পরশুদিন কিছু বহিরাগত নেশাগ্রস্থ যুবক এনে জনমানুষের আড়ালে তার খামারের ভিতরে লুকিয়ে কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন, কোন অনিয়ম হয়নি। আমি তো আজ খবর দেওয়ার আগেই শতশত কৃষক এসেছে এখানে মানববন্ধন করতে আমার পক্ষে, কিন্তু সে নিজের বাড়ির খামারে বসে লুকিয়ে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়। কই প্রকাশ্য দিবালোকে আসুক সে। তার বিরুদ্ধে পিবিআই তদন্তে সত্যতা পাওয়ায় সে এখন এসব করছে। আমরা আজকে কৃষকদের এ মানববন্ধন থেকে এসব কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মজিবুর রহমান বলেন, “আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। কোন তদন্তে কি প্রমাণ হয়েছে সেসব তারা বুঝুক, আমি এসবের কিছুই জানিনা।
এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জাহিদুল হক গণমাধ্যমে ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন যে ,মামলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সমিতির আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রম, ভাউচার এবং অডিট রিপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হয়েছে। তদন্তে বিভিন্ন খাতে হিসাব গরমিল, ভুয়া ও অসম্পূর্ণ ভাউচার ব্যবহারের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অপরাধের উপাদান পাওয়া যাওয়ায় আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
এবিষয়ে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফেরদৌস আলমগীর ভূঁইয়া সাংবাদিকদের সম্প্রতি গণমাধ্যমে বলেছেন, আমার এ অফিসে কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে পোগলা ইউনিয়ন সমবায় সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি লি: এর অডিট হয়নি। আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি আমাদের নজরে আসেনি। তবে এখন খোজ খবর নিচ্ছি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে, আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সম্প্রতি স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে এবং সমবায় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি বিষয়টিকেঘীরে কোন বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আগেই যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে যথাযথ পদক্ষেপ নেন এমনটাই আশা স্থানীয়দের।